বড় বিনিয়োগ পেয়েও সেবার মান বাড়াতে ব্যর্থ বিআরটিসি নতুন প্রকল্পেই বেশি জোর

সাশ্রয়ী ভাড়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সময় মেনে চলাচল, নিরাপদ যাতায়াত—রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) কাছে মোটাদাগে এ সেবাগুলোই প্রত্যাশা করে যাত্রীরা।

সাশ্রয়ী ভাড়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সময় মেনে চলাচল, নিরাপদ যাতায়াত—রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) কাছে মোটাদাগে এ সেবাগুলোই প্রত্যাশা করে যাত্রীরা। সরকারি সুবিধা ও বড় বিনিয়োগ পেয়ে আসা সংস্থাটি যদিও কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে বরাবরই ব্যর্থ হচ্ছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেড় হাজারের বেশি বাস কেনা হলেও বিআরটিসির বহরে এখন বাস আছে ১ হাজার ৩৫০টি। এর মধ্যে সচল বাসের সংখ্যা ১ হাজার ১৬৮। অর্থাৎ গত ১৫ বছরে কেনা বাসগুলোও ঠিক রাখতে পারেনি সরকারি এ সংস্থা।

বাস সংকট বর্তমানে বিআরটিসির প্রধান সমস্যা উল্লেখ করে সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ সংকট কাটাতে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ৩৪০টি বাস কেনার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বাস ছাড়াও কোস্টার-জাতীয় ছোট বাস কেনার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন বিআরটিসির কর্মকর্তারা। যদিও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন বাস সংকট নয়, গণপরিবহন সংস্থাটির প্রধান সমস্যা ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা আর দুর্নীতি। আদর্শ প্রতিষ্ঠানের যেসব বৈশিষ্ট্য থাকে, সেগুলো না থাকায় বিআরটিসি যাত্রীদের ভালো সেবা দিতে পারছে না বলে মনে করেন তারা। অন্যদিকে যাত্রীরা বলছে, সময়সূচি মেনে না চলা, পুরনো লক্কড়ঝক্কড় বাস, ভাঙাচোরা আসন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব, পথে বিকল হওয়ার ঝুঁকিসহ নানা সমস্যার কারণে বিআরটিসির কাছ থেকে তারা ভালো সেবা পাচ্ছে না। দেশের ২১৩টি রুটে বর্তমানে বাস পরিচালনা করছে বিআরটিসি।

বিআরটিসির বহরে বর্তমানে ১ হাজার ১৬৮টি বাস সচল থাকলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কেনা হয় ১ হাজার ৫৫৮টি। ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে এগুলো আনা হয়। খরচ পড়ে ১ হাজার ২৯৮ কোটি ৩৭ লাখ ২৯ হাজার টাকা, যার সিংহভাগই বিদেশী ঋণ।

বিআরটিসি সূত্রে জানা গেছে, নরডিক ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের ১১৩ কোটি ৬৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা ঋণ সহায়তায় চীনের ডংফেং ইয়াংসি থেকে ২৭৫টি একতলা সিএনজিচালিত বাস কেনা হয়। ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন ফান্ডের ২৭৮ কোটি ২৮ লাখ ৬২ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘দাইয়্যু বাস’ থেকে কেনা হয় ২৫৫টি সিএনজিচালিত এসি ও নন-এসি বাস। ইন্ডিয়ান ডলার ক্রেডিট লাইনের ৩৭৯ কোটি ৩৩ লাখ ১৮ হাজার টাকা ঋণের আওতায় ভারতের অশোক লেল্যান্ড থেকে ২৯০টি দ্বিতল, ৮৮টি একতলা ও ৫০টি আর্টিকুলেটেড বাস সংগ্রহ করা হয়। ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি-২) ৫২৭ কোটি ১২ লাখ ৪ হাজার টাকা ঋণে ভারত থেকে আনা হয় ৩০০ দ্বিতল, ১০০ করে এসি ও নন-এসি এবং ১০০ এসি ইন্টারসিটি বাস। বিআরটিসির বহরে বাস ছাড়াও রয়েছে ৫০৩টি ট্রাক, যেগুলো কেনা হয়েছে ভারত থেকে।

সংস্থাটি গত দেড় দশকে যেসব বাস কিনেছে সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে না পারায় অনেকগুলোই নষ্ট হয়ে গেছে। আবার দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণের কারণে এর আগে কেনা বাসগুলোও ধরে রাখতে পারেনি বিআরটিসি।

বছরের পর বছর ধরে জোড়াতালি দিয়ে বিআরটিসি যাত্রীদের সেবা দিয়ে আসছে বলে মন্তব্য করেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌যেকোনো সুশৃঙ্খল গণপরিবহন কোম্পানির কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকে। বৈশিষ্ট্যগুলো হলো কোনো রুটে বাস পরিচালনার আগে সমীক্ষা করা, বাস স্টপেজ, যাত্রী ছাউনি, টিকিট ব্যবস্থার পাশাপাশি যাত্রা শেষ করে বাস কীভাবে ফিরে আসবে এবং রাতে বাসটি কোথায় রাখা হবে তার যথাযথ পরিকল্পনা করে রাখা। বিআরটিসির মধ্যে এ বৈশিষ্ট্যগুলোয় আমি ঘাটতি দেখি। প্রতিষ্ঠানটি বছরের পর বছর ধরে জোড়াতালি দিয়ে যাত্রীদের সেবা দিচ্ছে। বাস রক্ষণাবেক্ষণেও প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত দায়িত্বশীলতা দেখাতে পারেনি।’

বিআরটিসি অনেকগুলো সুযোগ-সুবিধা পায়। তাদের কোনো রুট পারমিট লাগে না। সস্তায় বাস কিনতে পারে। বাস-ট্রাক পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সারা দেশে আছে অনেকগুলো ডিপো ও জনবল। অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ‘এত সুবিধা পাওয়া বিআরটিসি গণপরিবহন কোম্পানি হিসেবে যাত্রীসেবার একটি মানদণ্ড সহজেই তৈরি করতে পারত, কিন্তু তারা পুরোপুরি ব্যর্থ। কেনাকাটায় কর্মকর্তাদের পকেট ভারী হওয়ার সুযোগ আছে। তাই দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি কেনাকাটাতেই বেশি আগ্রহী।’

ড. সামছুল হকের মন্তব্যের প্রতিফলন পাওয়া গেছে বিআরটিসির সাম্প্রতিক এক পরিকল্পনায়। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বাস ও ট্রাক পরিচালনার পাশাপাশি এবার কোস্টার (ছোট বাস) পরিচালনার পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি। এজন্য কেনা হবে বেশকিছু কোস্টার-জাতীয় বাস। সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ পরিকল্পনা তুলে ধরেন বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌‌কতগুলো বাস কিনব এখনো তা আমরা ঠিক করিনি। কেনার জন্য অর্থের সংস্থানের জন্য সরকারি তহবিল বা বিদেশী ঋণের প্রয়োজন হতে পারে।’

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান মনে করছেন ‌বিআরটিসিতে বর্তমানে অন্যতম সমস্যা বাস সংকট। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, সংকট কাটাতে কোরিয়া (দক্ষিণ) থেকে বেশকিছু বাস সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যেসব বাস লিজে রয়েছে, সেগুলোও বহরে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর বাইরে সেবার মান বাড়ানোর লক্ষ্যে বিআরটিসির বাসগুলোয় র‍্যাপিড পাস প্রবর্তন করা হচ্ছে।

আরও